৬০ তম মৃত্যু বার্ষিকীতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী

ফাইয়াজ ফায়েল

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ছোট্ট কোঠায় বসে বসে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবছি, সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কথা। কেমন করে তাঁর সাথে আমার পরিচয় হল। কেমন করে তাঁর সান্নিধ্য আমি পেয়েছিলাম। কিভাবে তিনি আমাকে কাজ করতে শিখিয়েছিলেন এবং কেমন করে তাঁর স্নেহ আমি পেয়েছিলাম।” -বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অসমাপ্ত আত্মজীবনী গন্থে।
স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রধান স্থপতি বঙ্গবন্ধু এই কথা বলেছিলেন তাঁর রাজনৈতিক শিক্ষা গুরু গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সম্পকে। ১৯৬৯ বা সত্তর সনে শহীদ সাহেবের স্বরণ সভায় দাড়িয়ে “বাংলাদেশ” রাষ্ট্রের নাম করণের কথা বলেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর পূর্ব সূরীদের কিভাবে স্বরণ করতেন তা নিয়ে একটা কথা বলতে চাই, ছয় দফার শুরুতেই তিনি ১৯৪০সনের ২৩শে মার্চের শের ই বাংলার “লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে ” কথা দিয়ে শুরু করেছিলেন। ১৯৭০ ঐতিহাসিক নির্বাচনে জাতীর উদ্দেশ্যে ভাষনে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন শের এ বাংলা এবং সোহরাওয়ার্দী সাহেবও নাই। (তফাজ্জল হোসেন) মানিক ভাইও নাই।
আজ এই মহান নেতার ৬০তম মৃত্যু বার্ষিকী। উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ,জাতীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী।১৮৯২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম।তিনি ছিলেন বিচারপতি স্যার জাহিদ সোহরাওয়ার্দীর কনিষ্ঠ সন্তান।
তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এস.সি (সম্মান) ও বি.সি.এল ডিগ্রি লাভ করেন এবং পরে লন্ডনের গ্রেইজ ইন থেকে ব্যরিস্টার-এট-ল সম্পন্ন করেন।১৯২০ সালে ইংল্যান্ড থেকে ভারতে ফিরেই তিনি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে এ দেশের শান্তিপ্রিয় গণতন্ত্রকামী মানুষের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের প্রাক্কালে সোহরাওয়ার্দী সমগ্র বাংলা, আসাম ও বিহারের মানভূম, সিংভূম ও সম্ভবত পূণির্য়া জেলা সমন্বয়ে পূর্বভারতে ‘বৃহৎ বাংলা নামে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন।সোহরাওয়ার্দী তার গৌরবোজ্জ্বল রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন সময় নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ১৯২৪ সালে কলকাতা করপোরেশনের ডেপুটি মেয়র, ১৯৩৭ সালের নির্বাচনোত্তর ফজলুল হক কোয়ালিশন মন্ত্রিসভার শ্রম ও বাণিজ্যমন্ত্রী, ১৯৪৩-৪৫ সালে খাজা নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রিসভায় বেসামরিক সরবরাহ মন্ত্রী, ১৯৪৬-৪৭ সালে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, পাকিস্তান আমলে ১৯৫৪-৫৫ সালে মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রিসভার আইনমন্ত্রী এবং ১৯৫৬-৫৭ সালে ১৩ মাস পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন।
১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম লীগকে বাংলায় সুপ্রতিষ্ঠিত করা এবং এর অগ্রযাত্রায় সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা ছিল অসামান্য।১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে তিনি মুসলিম লীগ সরকারের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ভূমিকা পালন করেন।১৯৪৯ সালের ২৩ জুন তৎকালীন পাকিস্তানের প্রথম ও প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ) প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ভাষা আন্দোলনের পর বাঙালির যে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল তার অন্যতম নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। পরে গণতন্ত্রকামী বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠনে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন নেতাদের অন্যতম এবং ১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রথম প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক বিজয়ের পেছনেও তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল।
গণতান্ত্রিক রীতি ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন তিনি। তাই তাকে ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’বলে আখ্যা দেয়া হয়। পাকিস্তানের ১৯৫৬ সালের সংবিধান প্রণয়নেও সোহরাওয়ার্দী তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।পাকিস্তানে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এনডিএফ) গঠন করে তিনি ১৯৬২-৬৩ সালে আইয়ুববিরোধী সম্মিলিত জোটের আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।
স্বাস্থ্যগত কারণে ১৯৬৩ সালে দেশের বাইরে যান এবং লেবাননের রাজধানী বৈরুতে অবস্থানকালে ৫ ডিসেম্বর বৈরুতের কন্টিনেন্টাল হোটেলে মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকার হাইকোর্টের পাশে তিন নেতার মাজারে প্রখ্যাত এই নেতার সমাধি রয়েছে।
মৃত্যু বার্ষিকীতে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাএবং স্মরণ এই মহান নেতার প্রতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *